
জোয়ার-ভাটা কীভাবে সংঘটিত হয়? সূর্যের প্রভাব ও কারণ
জোয়ার-ভাটা কীভাবে সংঘটিত হয়? জোয়ার-ভাটার ওপর সূর্যের প্রভাব
জোয়ার-ভাটা কীভাবে হয়? সমুদ্রের পানি একবার উপকূলের দিকে এগিয়ে আসে, আবার একসময় দূরে সরে যায়—পানির এই নিয়মিত ওঠানামাকেই বলা হয় জোয়ার-ভাটা। পৃথিবীর প্রায় সব উপকূলীয় অঞ্চলে প্রতিদিনই এই প্রক্রিয়া চোখে পড়ে। বাংলাদেশের বঙ্গোপসাগর-তীরবর্তী অঞ্চলে জোয়ার-ভাটা মানুষের দৈনন্দিন জীবন, কৃষি, মাছ ধরা এমনকি নৌপরিবহনকেও প্রভাবিত করে।
তাহলে জোয়ার-ভাটা আসলে কেন ঘটে? চাঁদ ও সূর্য কীভাবে সমুদ্রের পানির এই ওঠানামা নিয়ন্ত্রণ করে—এই প্রশ্নের উত্তর সহজ ভাষায় খোঁজার চেষ্টা করা যাক।
জোয়ার-ভাটা কী?
সমুদ্রের পানির উচ্চতা নিয়মিতভাবে বাড়লে তাকে জোয়ার বলা হয়, আর কমলে বলা হয় ভাটা।
জোয়ারের সময় পানি উপকূলের দিকে এগিয়ে এসে স্তর উঁচু করে তোলে। ভাটার সময় ঘটে ঠিক তার উল্টোটা—পানি সরে যায়, স্তর নেমে যায়।
বেশিরভাগ উপকূলীয় অঞ্চলে দিনে দুটি জোয়ার ও দুটি ভাটা দেখা যায়, যদিও স্থানভেদে এই সংখ্যা এবং সময়ের ভেদাভেত হতে পারে।
জোয়ার-ভাটা কীভাবে সংঘটিত হয়?
চাঁদ ও সূর্যের মহাকর্ষীয় আকর্ষণ এবং পৃথিবী-চাঁদ ব্যবস্থার নিজস্ব গতিই জোয়ার-ভাটার মূল কারণ। এর মধ্যে চাঁদের প্রভাবই সবচেয়ে প্রবল।
১. চাঁদের মহাকর্ষীয় আকর্ষণ
চাঁদ পৃথিবীর চারপাশে ঘুরতে থাকে, আর একই সঙ্গে তার মহাকর্ষীয় শক্তি পৃথিবীর সমুদ্রের পানিকে নিজের দিকে টানে।
ফলে চাঁদের মুখোমুখি অংশে সমুদ্রের পানি তুলনামূলক বেশি ফুলে ওঠে—এখানেই জোয়ার তৈরি হয়।
পৃথিবীর ঠিক বিপরীত পাশেও সাধারণত আরেকটি জোয়ার দেখা দেয়। পৃথিবী ও চাঁদের সম্মিলিত ঘূর্ণন এবং দুই দিকের মহাকর্ষীয় বলের পার্থক্যই এর কারণ।
এই দুই জোয়ারের মাঝামাঝি জায়গাগুলোতে পানির উচ্চতা তুলনামূলক কম থাকে, আর সেখানেই দেখা যায় ভাটা।
২. পৃথিবীর আবর্তন
পৃথিবী নিজ অক্ষে ঘোরে, ফলে বিভিন্ন উপকূলীয় অঞ্চল ক্রমাগত জোয়ার সৃষ্টিকারী পানির স্ফীত অংশগুলোর মধ্য দিয়ে অতিক্রম করে।
এই কারণেই অনেক উপকূলে দিনে প্রায় দুটি জোয়ার ও দুটি ভাটা ঘটে; দুটি পরপর জোয়ারের মাঝের সময় সাধারণত প্রায় ১২ ঘণ্টা ২৫ মিনিট।
তবে উপকূলের আকৃতি, সমুদ্রের গভীরতা, দ্বীপপুঞ্জ ও স্থানীয় ভূগোল—এসবের প্রভাবে জোয়ার-ভাটার সময় ও উচ্চতা জায়গাভেদে বদলে যায়।
জোয়ার-ভাটার ওপর সূর্যের প্রভাব কী?
পৃথিবীর সবচেয়ে কাছের নক্ষত্র সূর্য, আর তারও একটা মহাকর্ষীয় টান সমুদ্রের পানির ওপর কাজ করে। চাঁদের চেয়ে আকারে অনেক বড় হলেও সূর্য পৃথিবী থেকে বহু দূরে অবস্থিত বলে জোয়ার-ভাটা সৃষ্টিতে তার প্রভাব চাঁদের তুলনায় কম।
সূর্য ও চাঁদ কোন অবস্থানে আছে তার ওপর নির্ভর করে সূর্য কখনো জোয়ারকে আরও শক্তিশালী করে তোলে, আবার কখনো তার উচ্চতা কমিয়ে দেয়।
১. ভরা কটাল বা প্রবল জোয়ার
অমাবস্যা ও পূর্ণিমায় সূর্য, পৃথিবী ও চাঁদ প্রায় একই সরলরেখায় চলে আসে। তখন সূর্য ও চাঁদের জোয়ার-সৃষ্টিকারী প্রভাব একে অপরকে জোরদার করে তোলে।
এর ফলে জোয়ারের উচ্চতা বেড়ে যায় এবং ভাটার সময় পানির স্তর তুলনামূলক নিচে নেমে যায়। একেই বলা হয় ভরা কটাল বা Spring Tide।
২. মরা কটাল বা দুর্বল জোয়ার
চাঁদের প্রথম ও তৃতীয় চতুর্থাংশের সময় পৃথিবী থেকে দেখলে সূর্য ও চাঁদের অবস্থানের মধ্যে প্রায় ৯০ ডিগ্রি কোণ তৈরি হয়।
তখন সূর্য ও চাঁদের জোয়ার-সৃষ্টিকারী প্রভাব একে অপরকে আংশিকভাবে প্রতিহত করে, ফলে জোয়ার ও ভাটার উচ্চতার পার্থক্য কমে আসে।
এই অবস্থাকেই বলা হয় মরা কটাল বা Neap Tide।
জোয়ার-ভাটার ওপর সূর্য ও চাঁদের প্রভাবের পার্থক্য
| বিষয় | চাঁদের প্রভাব | সূর্যের প্রভাব |
|---|---|---|
| মহাকর্ষীয় ভূমিকা | জোয়ার-ভাটার প্রধান চালিকা শক্তি | জোয়ার-ভাটাকে শক্তিশালী বা দুর্বল করে |
| পৃথিবী থেকে দূরত্ব | তুলনামূলকভাবে কম | অনেক বেশি |
| প্রবল জোয়ারে ভূমিকা | সূর্যের সঙ্গে মিলিতভাবে জোয়ার বাড়ায় | চাঁদের সঙ্গে মিলিতভাবে জোয়ার বাড়ায় |
| দুর্বল জোয়ারে ভূমিকা | সূর্যের প্রভাবের সঙ্গে মিলে জোয়ারের পার্থক্য কমায় | চাঁদের প্রভাবের সঙ্গে মিলে জোয়ারের পার্থক্য কমায় |
জোয়ার-ভাটার গুরুত্ব
জোয়ার-ভাটা কেবল সমুদ্রের পানির ওঠানামা নয়—উপকূলীয় পরিবেশ ও মানুষের জীবনেও এর ভূমিকা যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ।
১. মাছ ধরা: জোয়ার-ভাটার সময় বদলের সঙ্গে মাছের চলাচল ও মাছ ধরার উপযুক্ত সময়ের একটা সম্পর্ক থাকতে পারে।
২. নৌপরিবহন: জোয়ারের সময় নদী ও মোহনায় পানির গভীরতা বেড়ে যায়, যা কিছু নৌযানের চলাচল সহজ করে দেয়।
৩. কৃষিকাজ: কোথাও জোয়ারের পানি পলি জমাতে সাহায্য করে, আবার কোথাও লবণাক্ত পানি কৃষিজমিতে ঢুকে ফসলের ক্ষতি করতে পারে।
৪. উপকূলের পরিবর্তন: পলি ও বালু বহন করে জোয়ার-ভাটা উপকূলের ভূমিরূপ আর নদীর মোহনাকে ধীরে ধীরে বদলে দেয়।
৫. বিদ্যুৎ উৎপাদন: কিছু দেশ জোয়ার-ভাটার পানির ওঠানামা ও স্রোতকে কাজে লাগিয়ে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ তৈরি করে।
বাংলাদেশের ওপর জোয়ার-ভাটার প্রভাব
বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চল বঙ্গোপসাগরের তীরে অবস্থিত বলে দেশের উপকূলীয় এলাকা ও অসংখ্য নদীতে জোয়ার-ভাটার প্রভাব স্পষ্ট।
সুন্দরবন, উপকূলীয় দ্বীপ ও নদীর মোহনায় এই প্রভাব বিশেষভাবে চোখে পড়ে—পলি পরিবহন, মাছের চলাচল এবং জীববৈচিত্র্যের ওপর এর প্রত্যক্ষ প্রভাব রয়েছে।
অমাবস্যা বা পূর্ণিমার প্রবল জোয়ারের সঙ্গে যদি ঘূর্ণিঝড়জনিত জলোচ্ছ্বাস কিংবা নিম্নচাপ যুক্ত হয়ে যায়, তাহলে উপকূলীয় এলাকায় পানির উচ্চতা বিপজ্জনক মাত্রায় বেড়ে যেতে পারে। এ কারণেই উপকূলবাসীর জন্য আবহাওয়ার পূর্বাভাস ও সতর্কবার্তা মেনে চলা জরুরি হয়ে পড়ে।
উপসংহার
জোয়ার-ভাটা পৃথিবীর একটি স্বাভাবিক, নিয়মিত প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া। চাঁদের মহাকর্ষীয় আকর্ষণই এর মূল কারণ, তবে সূর্যের মহাকর্ষীয় প্রভাব জোয়ারের উচ্চতা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অমাবস্যা-পূর্ণিমায় সাধারণত প্রবল জোয়ার দেখা যায়, আর চাঁদের প্রথম-তৃতীয় চতুর্থাংশে জোয়ার থাকে তুলনামূলক দুর্বল।
জোয়ার-ভাটার এই কারণ ও প্রভাব বুঝলে সমুদ্র, উপকূলীয় পরিবেশ এবং পৃথিবীর প্রাকৃতিক ব্যবস্থাকে আরও ভালোভাবে চেনা যায়।
মন্তব্য প্রধান বন্ধ আছে।
[…] সম্পদও রয়েছে। মাছ, লবণ, খনিজ, তেল এবং প্রাকৃতিক গ্যাস এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য। Therefore, […]
[…] একটি। এর মূল উৎস গঙ্গা নদী, যা হিমালয়ের গঙ্গোত্রী হিমবাহ অঞ্চল থেকে উৎপন্ন […]